প্রতিদিন ৫ মিনিট শরীরচর্চায় মিলবে দীর্ঘায়ু: নতুন গবেষণা

ভোরবেলা অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে মন চায় না অনেকেরই। শরীরচর্চার কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে জিমের কঠিন পরিশ্রম বা দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর দৃশ্য। কিন্তু যদি বলা হয়, দিনে মাত্র পাঁচ মিনিটের একটু দ্রুত হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙাই আপনার আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকটা? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, অলস বসে থাকার চেয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মাঝারি পরিশ্রম লক্ষ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে সক্ষম। দীর্ঘায়ু হওয়ার এই সহজ এবং কার্যকর পথটি নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা।

ব্যায়াম মানেই কি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানো?

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ধারণা ছিল যে সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় জিমে কাটাতে হবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণাকে কিছুটা বদলে দিচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের ওপর পরিচালিত একটি বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক সক্রিয়তার সামান্য বৃদ্ধিও আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গবেষকরা বলছেন, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট মাঝারি মানের শরীরচর্চা যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার ফলে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় দশ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্টসের অধ্যাপক উলফ একেলুন্ড জানান, প্রতিদিনের জীবনে এই সামান্য পরিবর্তনগুলো পুরো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘায়ুর ওপর বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা সারাদিন বসে কাজ করেন বা খুব একটা নড়াচড়া করেন না, তাদের জন্য এই পাঁচ মিনিটের ফর্মুলা হতে পারে জীবনদায়ী। তবে এর মানে এই নয় যে পাঁচ মিনিট ব্যায়ামই যথেষ্ট, বরং এটি একটি শুরু যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার দিকে নিয়ে যাবে।

এক্সারসাইজ স্নাকিং: শরীরচর্চার নতুন ও সহজ কৌশল

গবেষণায় একটি চমৎকার শব্দ উঠে এসেছে, সেটি হলো ‘এক্সারসাইজ স্নাকিং’। যেমন আমরা মূল খাবারের মাঝে হালকা কিছু নাস্তা করি, ঠিক তেমনি সারাদিনের কাজের ফাঁকে ছোট ছোট বিরতিতে ব্যায়াম করাকেই বলা হচ্ছে এক্সারসাইজ স্নাকিং। এটি কোনো ভারী জিম সেশন নয়, বরং আপনার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। কিচেনে রান্না বসিয়ে কয়েক মিনিট নাচানাচি করা, লিফট ব্যবহার না করে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা, কিংবা ঘরের মেঝে দ্রুত মোছা এই সবই হতে পারে আপনার সুস্থতার চাবিকাঠি।

আলস্টার ইউনিভার্সিটির ব্যায়াম ও স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক মারি মারফি মনে করেন, এই ছোট ছোট বিরতির ব্যায়াম আমাদের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজমকে উদ্দীপ্ত করে। আমরা যখন ব্যায়াম থামিয়ে দিই, তখনও আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বেশ কিছুক্ষণ সক্রিয় থাকে। ফলে সারাদিনে বারবার কয়েক মিনিটের শরীরচর্চা শরীরকে সচল রাখতে এবং মেদ জমতে বাধা দিতে দারুণ কার্যকর।

কেন ৫ মিনিট এত গুরুত্বপূর্ণ?

আমাদের অনেকেরই বড় বাধা হলো সময়ের অভাব। অফিসের কাজ, ঘরের কাজ আর যানজটের এই শহরে নিজের জন্য আলাদা এক ঘণ্টা সময় বের করা অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব। এখানেই ৫ মিনিটের গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একদমই ব্যায়াম করেন না, তাদের তুলনায় যারা সামান্য ৫-১০ মিনিট সক্রিয় থাকেন, তাদের হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোল লোগান বলেন, শারীরিক শক্তি, পেশির মান এবং হাড়ের মজবুতি পরবর্তীতে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পেতে সাহায্য করে। এটি শুধু শরীর নয়, আমাদের মানসিক চাপ এবং বার্নআউট কমাতেও সহায়ক।

গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিদিন বসে থাকার সময় থেকে মাত্র ৩০ মিনিট কমিয়ে যদি সক্রিয় থাকা যায়, তবে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৭ শতাংশ কমে আসে। এটি বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি, যেখানে স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের হার ক্রমেই বাড়ছে।

হৃদরোগ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে ছোট পদক্ষেপ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্থ থাকার জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি পরিশ্রমের পরামর্শ দেয়। কিন্তু অনেকের কাছে এই লক্ষ্যমাত্রা পাহাড়সম মনে হতে পারে। অধ্যাপক একেলুন্ডের মতে, যারা জিম বা স্পোর্টস ক্লাবে যেতে পারেন না, তারা যদি নিজেদের দৈনন্দিন চলাফেরায় একটু গতি আনেন, তবেই সুফল মিলবে।

ষাট বা সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ওপর চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করার মতো ছোটখাটো কাজ করেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি যারা কোনো ব্যায়াম করেন না তাদের তুলনায় অনেক কম। এক্সারসাইজ স্নাকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি করতে বাড়তি কোনো উপকরণের প্রয়োজন হয় না এবং এটি ক্লান্তিকরও নয়। ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই পদ্ধতিটি সহজে তাদের জীবনের অংশ করে নিতে পেরেছেন কারণ এটি রুটিনে সহজেই খাপ খেয়ে যায়।

কিভাবে শুরু করবেন ‘স্নাকটিভিটি’?

লাফবরো ইউনিভার্সিটির আচরণগত ওষুধের অধ্যাপক আমান্ডা ডালি এই ছোট ছোট শারীরিক কর্মকাণ্ডকে বলছেন ‘স্নাকটিভিটি’। তিনি পরামর্শ দেন কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলার। যেমন, নিজের গন্তব্যের পাঁচ মিনিট আগে গাড়ি বা রিকশা থেকে নেমে হেঁটে যাওয়া। ফোন কল রিসিভ করার সময় বসে না থেকে ঘরের মধ্যে পায়চারি করা। বাজারে যাওয়ার সময় ভারী ব্যাগ বহন করাও এক ধরণের শরীরচর্চা। এসব ছোট ছোট অভ্যাসগুলো অবচেতন মনেই আমাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।

এমনকি প্রতিদিন মাত্র ২,৫০০ থেকে ২,৭০০ কদম হাঁটাও হৃদরোগের ঝুঁকি ১১ শতাংশ কমিয়ে দেয়। তাই ১০ হাজার কদম হাঁটার লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সামান্য যা-ই করছেন, তা আপনার শরীরের জন্য জমানো পুঁজির মতো কাজ করছে।

পেশি ও হাড়ের সুরক্ষায় গুরুত্ব

শুধু হাঁটা বা দৌড়ানোই নয়, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামগুলোও অত্যন্ত জরুরি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। ঘরে বসে ওঠবোস করা বা ভারি কোনো জিনিস নাড়াচাড়া করা পেশির জন্য উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত এই ধরণের কাজ করেন তারা দীর্ঘকাল স্বাবলম্বী থাকতে পারেন এবং বার্ধক্যের জটিলতাগুলো তাদের দেরিতে স্পর্শ করে।

খাবার রান্নার সময় চুলায় পানি ফুটতে যে সময় লাগে, সেই সময়টুকুতে কয়েকটা স্কোয়াট বা লেগ কিকস করে নেওয়া যেতে পারে। টেলিভিশন দেখার সময় বাণিজ্যিক বিরতির সময়টুকুতে সোফায় বসে না থেকে একটু হাত-পা নাড়াচাড়া করা যেতে পারে। এই সব কিছুই আপনার আয়ু বাড়াতে অবদান রাখছে।

সুস্থ থাকার জন্য জাদুকরী কোনো শর্টকাট নেই, তবে ছোট ছোট পদক্ষেপের শক্তি অপরিসীম। প্রতিদিনের মাত্র পাঁচ মিনিটের সচেতনতা আপনাকে দিতে পারে একটি নিরোগ দীর্ঘ জীবন। তাই আজ থেকেই শুরু করুন, লিফটের বদলে সিঁড়ি নিন অথবা অন্তত কয়েক মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করুন। মনে রাখবেন, অলস বসে থাকার চেয়ে সামান্য নড়াচড়াও আপনার শরীরের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। সুস্থ থাকার এই পথটি অনেক সহজ, শুধু প্রয়োজন আপনার ইচ্ছাশক্তি।

সূত্র: বিবিসি নিউজ

 

 

লেখাটি শেয়ার করুন:

আরও সংবাদ পড়ুন

ব্লুমো নিউজ দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর, বিশ্লেষণ ও তথ্যের মাধ্যমে আপনাকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন