ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার নতুন অস্ত্র যখন ভুয়া ফটোকার্ড

ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের নিউজফিডে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ে দেশের কোনো একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের লোগো সংবলিত একটি গ্রাফিক কার্ড বা ফটোকার্ড। সেখানে কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য বা রাজনৈতিক নেতার বিতর্কিত কোনো উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। চোখের নিমেষে বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়া সেই তথ্যটি আপনি হয়তো শেয়ারও করে দিলেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যটি হলো, সেই ফটোকার্ডটি ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট। বাংলাদেশে স্যোশাল মিডিয়া পরিসরে এই রকম ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার নানা রকম বিভ্রান্তির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ডিজিটাল মারণাস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিছু লোক খুব অল্প খরচে জনমতকে প্রভাবিত করার এই নোংরা খেলাটা খেলছে।

তথ্যের ছদ্মবেশে অপপ্রচারের সূক্ষ্ম কারিগরি

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে অন্তত ৬৯০টি স্বতন্ত্র ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত করা হয়েছে। ডিসমিসল্যাবের (Dismislab) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রায় অর্ধেকই ছিল মূলধারার সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি করা এসব কার্ড। এই অপপ্রচারের কৌশলটি অত্যন্ত সুনিপুণ।

অপরাধ, গ্রেপ্তার বা জরিপ সংক্রান্ত বানোয়াট সংবাদ প্রতিবেদন হিসেবে ৫১.৭ শতাংশ কার্ড তৈরি করা হয়, যেখানে বাকি ৪৮.৩ শতাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের নামে মিথ্যা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই ভুয়া কার্ডগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ তারা সংবাদপত্রের পরিচিত লোগো এবং ফন্ট দেখেই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যান ।

রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু

এই প্রোপাগান্ডা মেশিনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল এবং তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই অপপ্রচারের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ২৮১টি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৬টিই ছিল নেতিবাচক। এরপরই রয়েছে বিএনপি, যাদের বিরুদ্ধে ২১২টি মিথ্যা ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে। বিপরীতে, আওয়ামী লীগ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন; তাদের অনুকূলে জনসমর্থন তৈরির উদ্দেশ্যে ভুয়া গণমিছিল বা নির্বাচনী অগ্রগতির মিথ্যা দাবি সম্বলিত কার্ড প্রচার করা হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে ৭৮টি এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে ৬১টি বানোয়াট আখ্যান তৈরি করা হয়েছে, যা সরাসরি ভোটারদের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার চেষ্টা ছিল।

লৈঙ্গিক সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক উসকানির নতুন হাতিয়ার

ফটোকার্ডের মাধ্যমে কেবল রাজনৈতিক আক্রমণই নয়, বরং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং সাম্প্রদায়িক বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্তত ৩৪টি ক্ষেত্রে রাজনীতি ও জনসেবায় সম্পৃক্ত নারীদের লক্ষ্য করে যৌন হয়রানিমূলক এবং অবমাননাকর ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে। ডা. তাসনিম জারা বা সাবিকুন্নাহার তামান্নার মতো ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিথ্যা এবং কুরুচিপূর্ণ তথ্য ছড়িয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা। ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এই ধরনের স্পর্শকাতর মিথ্যা তথ্যগুলো মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করার সক্ষমতা রাখে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভুয়া ফটোকার্ডের সংকটটি কেবল তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা নয়, বরং এটি সাংবাদিকতার মৌলিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট আঘাত। আমার দেশের সহযোগী সম্পাদক আলফাজ আনাম যথার্থই বলেছেন যে, পরিচিত লোগো দেখে মানুষ যখন তথ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরে যখন সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন সেই নেতিবাচক প্রভাবটি গিয়ে পড়ে মূল সংবাদমাধ্যমের ওপর। ইউল্যাবের অধ্যাপক ড. সুমন রহমান এই প্রবণতাকে দেখছেন ‘সবচেয়ে কম খরচে অপপ্রচার ভাইরাল করার কৌশল’ হিসেবে। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি এই কার্ডগুলোর প্রচার তুঙ্গে উঠেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ভোটদানের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা। এটি স্পষ্ট যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা না বাড়লে গণমাধ্যমের অস্তিত্বের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ৯টি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে এই ৬৯০টি ভুয়া কার্ড শনাক্ত করেছে। তথ্য বলছে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদিকে নিয়ে অপপ্রচার কিংবা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লন্ডন থেকে ফেরার সময় অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মারা যাওয়ার মিথ্যা গল্পগুলো ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। বিশেষজ্ঞ পূর্বাভাস বলছে, আগামী দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে আরও নিখুঁত ফটোকার্ড তৈরির ঝুঁকি বাড়ছে। যদি এখনই জাতীয় পর্যায়ে মিডিয়া লিটারেসি বা সংবাদ সচেতনতা বৃদ্ধি না করা হয়, তবে এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভুয়া ফটোকার্ডের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রতিটি নাগরিককে তথ্যের গ্রাহক থেকে তথ্যের পরীক্ষক হয়ে উঠতে হবে। কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করার আগে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ভেরিফায়েড পেজ যাচাই করা এখন সময়ের দাবি। গণমাধ্যমগুলোকেও তাদের ব্র্যান্ড সুরক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে এবং নিয়মিতভাবে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সত্য আর মিথ্যার এই অসম যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আমাদের বিচারবুদ্ধি এবং সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর আইনি কাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাই পারে একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।

লেখাটি শেয়ার করুন:

আরও সংবাদ পড়ুন

ব্লুমো নিউজ দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর, বিশ্লেষণ ও তথ্যের মাধ্যমে আপনাকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন