শিশুর হাতে স্মার্টফোন : ডিজিটাল জালে বন্দি শৈশব

সাধারণ বিকেলের দৃশ্য। রান্নাঘরে মা ব্যস্ত রাতের খাবার তৈরিতে। ড্রয়িংরুমে তার দেড় বছরের শিশু ফোনে কার্টুন দেখছে। শিশুটি শান্ত আছে, কোনো কান্নাকাটি নেই। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি স্বস্তির দৃশ্য মনে হতে পারে। কিন্তু খুব শৈশবে শিশুর মোবাইল দেখার প্রভাব নিয়ে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় ডিজিটাল ডিভাইসগুলো এখন শিশুদের জন্য এক ধরণের ডিজিটাল আয়া বা বেবিসিটার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই সাময়িক প্রশান্তি ভবিষ্যতে বড় ধরণের মানসিক সমস্যার বীজ বপন করছে শিশুর মধ্যে।

বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালের গবেষকরা সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে চারশ জনেরও বেশি শিশুর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা চালিয়েছেন। এই গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ১২ মাস বয়সে তারা কতক্ষণ পর্দার সামনে সময় কাটাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসে। গবেষকরা যখন শিশুদের ১৮ মাস বয়সে তাদের মস্তিষ্কের ইইজি বা ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাম পরীক্ষা করেন, তখন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। পর্দার সামনে বেশি সময় কাটানো শিশুদের মস্তিষ্কে থিটা ওয়েভ বা ধীর গতির তরঙ্গের আধিক্য দেখা গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১২ মাস বয়সে একটি শিশু যত বেশি সময় স্মার্টফোন বা টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে, ১৮ মাস বয়সে তার মস্তিষ্কে থিটা এবং বিটা ওয়েভের অনুপাত তত বেশি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সাধারণত উচ্চ মাত্রার থিটা ওয়েভ মানুষের মনোযোগহীনতা এবং সতর্কতা কমে যাওয়ার সংকেত দেয়, যা পরবর্তী জীবনে শেখার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এই গবেষণার সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। গবেষকরা ওই শিশুদের ৯ বছর বয়স পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেছেন। দেখা গেছে, যারা শৈশবে বেশি স্ক্রিন টাইম বা পর্দার সামনে সময় কাটিয়েছে, বড় হওয়ার পর তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোনিবেশ করতে পারছে না। একই সাথে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং জেদ দমানোর ক্ষমতাও অন্যদের তুলনায় অনেক কম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় এক্সিকিউটিভ ফাংশনিং এর সমস্যা, যা একজন মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য প্রয়োজন চারপাশের পরিবেশের সাথে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া। ডক্টর ক্যারল উইলকিনসন, যিনি এই গবেষণার অন্যতম সদস্য, তিনি জানিয়েছেন যে একটি শিশুর মস্তিষ্ক সমৃদ্ধ হয় বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা থেকে। যখন একটি শিশু খেলনা নিয়ে খেলে বা মানুষের সাথে কথা বলে, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো যেভাবে উদ্দীপিত হয়, পর্দার একমুখী ছবির মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। স্ক্রিন টাইম মূলত শিশুর সেই মূল্যবান সময়গুলো কেড়ে নেয়, যা তার মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।

বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই এখন শিশুদের খাওয়ানোর সময় কিংবা শান্ত রাখার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিশু যদি ইউটিউবে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখে তবে সেটি হয়তো উপকারী। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য যেকোনো ধরণের স্ক্রিন টাইম ক্ষতিকর। আমাদের দেশে অনেক শিশুর দেরিতে কথা বলা বা অটিজমের মতো লক্ষণের পেছনে এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়ার পেছনেও এই ডিজিটাল আসক্তি কাজ করছে।

আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ মাস বয়সের আগে শিশুদের কোনো ধরণের ডিজিটাল মিডিয়ার সংস্পর্শে আনা উচিত নয়। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি। কিন্তু বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, অনেক শিশু গড়ে দিনে ৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর্দার সামনে কাটাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে একটি মনোযোগহীন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে।

যদি আপনার শিশুকে পর্দার সামনে রাখতেই হয়, তবে তা একা ছাড়বেন না। শিশুর সাথে বসে ভিডিওটি দেখুন এবং সেটি নিয়ে কথা বলুন। ভিডিওর চরিত্রগুলো কী করছে তা তাকে বুঝিয়ে বলুন এবং তাকে প্রশ্ন করুন। এতে একমুখী যোগাযোগের বদলে একটি দ্বিমুখী মিথস্ক্রিয়া তৈরি হবে। তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো শিশুকে খেলনা, বই বা মাটির সাথে খেলতে দেওয়া। মনে রাখবেন, শৈশবের এই কয়েক বছরের ডিজিটাল আসক্তি আপনার সন্তানের সারাজীবনের মানসিক সক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে।

 

লেখাটি শেয়ার করুন:

আরও সংবাদ পড়ুন

ব্লুমো নিউজ দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর, বিশ্লেষণ ও তথ্যের মাধ্যমে আপনাকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন