“আমরা আপনার চিকিৎসা করতে পারি, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আপনার স্বামীর জন্য আমাদের খুব বেশি কিছু করার নেই।” ডাক্তার যখন ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা জেনিফার হ্যানিংটনকে এই কথাটি বলেন, তখন দম্পতিটি স্তম্ভিত হয়ে যান। জেনিফারের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম ছিল, তাই তারা জানতেন সন্তান ধারণ করা কিছুটা কঠিন হতে পারে। কিন্তু আসল ধাক্কাটি আসে যখন দেখা যায় তার স্বামী সিয়ারানের শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গতিশীলতা অত্যন্ত কম। সিয়ারান তখন এক গভীর মানসিক সংকটে পড়েন। তিনি নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে বিষণ্ণতা ও অ্যালকোহলের আশ্রয় নেন। সিয়ারানের এই গল্পটি আজ বিশ্বের কোটি কোটি পুরুষের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে।
শুক্রাণুর রহস্যময় পতন ও বিজ্ঞান
পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি মূলত নির্ভর করে শুক্রাণুর সংখ্যা, এর আকৃতি এবং এর সচলতার ওপর। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির মহামারীবিদ্যার অধ্যাপক হাগাই লেভিন এই বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা চালিয়েছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি মিলিলিটার বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা যদি ৪০ মিলিয়নের নিচে নেমে যায়, তবে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা দ্রুত কমতে শুরু করে। লেভিনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের শুক্রাণুর গড় সংখ্যা ১০৪ মিলিয়ন থেকে কমে মাত্র ৪৯ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, ১৯৭৩ সাল থেকে শুক্রাণুর সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১.২ শতাংশ হারে কমেছে। তবে চিন্তার বিষয় হলো, ২০০০ সালের পর থেকে এই হ্রাসের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন শুক্রাণু কমার হার প্রতি বছর প্রায় ২.৬ শতাংশের বেশি। অধ্যাপক লেভিন সতর্ক করে বলেছেন যে, আমরা একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি এবং এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কি না তা এখনও অনিশ্চিত।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই পরিবর্তনের পেছনে এপিজেনেটিক্স বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন কাজ করছে। পরিবেশগত এবং জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাবগুলো ডিএনএর কার্যপদ্ধতি বদলে দিচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই সমস্যাটি বংশপরম্পরায় স্থানান্তরিত হতে পারে। অর্থাৎ, আজকের পরিবেশ দূষণের প্রভাব কেবল বর্তমান প্রজন্মের ওপর নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতার ওপরও স্থায়ী ছাপ রেখে যাচ্ছে।
বিষাক্ত পৃথিবী এবং আমাদের ঘরবাড়ি
নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রেবেকা ব্লানচার্ড পরিবেশগত রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থা বুঝতে কুকুরকে একটি সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেহেতু কুকুর মানুষের সাথে একই পরিবেশে থাকে এবং একই ধরণের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, তাই তাদের ওপর চালানো গবেষণার ফল মানুষের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। ব্লানচার্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ঘরের সাধারণ প্লাস্টিক পণ্য, আসবাবপত্রের অগ্নি-প্রতিরোধক রাসায়নিক এবং নিত্যপণ্যে থাকা কেমিক্যালগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
এই রাসায়নিকগুলো কেবল শুক্রাণুর সংখ্যাই কমায় না, বরং শুক্রাণুর ডিএনএ-র কাঠামোও ভেঙে দেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বলা হয়। যখন শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন গর্ভধারণ হলেও গর্ভপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তথ্য বলছে, প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত বিপিএ বা বিসফেনল-এ এবং থ্যালেটসের মতো উপাদানগুলো সরাসরি পুরুষদের প্রজননতন্ত্রের ক্ষতি করছে। এমনকি এই বিষাক্ত কণাগুলো মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর প্রজনন অঙ্গের বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার চাপ
পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও পুরুষদের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা শুক্রাণুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাপপ্রবাহের সময় পতঙ্গদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং মানুষের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা অত্যন্ত গরম পরিবেশে কাজ করার ফলে পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন, যা প্রতিকূল পরিবেশে সম্ভব হয় না।
আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ, প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং শরীরচর্চার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আগে মনে করা হতো কেবল নারীদের ক্ষেত্রেই বয়স বাড়লে প্রজনন ক্ষমতা কমে, কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে পুরুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুক্রাণুর মানও কমতে থাকে। অধিক বয়সে বাবা হওয়ার ফলে সন্তানের জিনগত ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর সাথে যোগ হয়েছে ধূমপান এবং অ্যালকোহলের অভ্যাস, যা শুক্রাণুর গতিশীলতাকে সরাসরি আঘাত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: এক অদৃশ্য হুমকি
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বায়ু দূষণ এবং খাদ্যে ভেজাল পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার বায়ুতে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বা ব্ল্যাক কার্বন সরাসরি রক্তপ্রবাহে মিশে গিয়ে প্রজননতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশেও বন্ধ্যাত্বের হার আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষরা দায়ী। গ্রামাঞ্চলে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং শহরে প্লাস্টিকের অতিব্যবহার এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পুরুষই চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধা করেন, যা সমস্যাটিকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে।
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ পূর্বাভাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস বলছে, যদি শুক্রাণুর সংখ্যা কমার এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৪৫ সালের মধ্যে অধিকাংশ পুরুষই প্রাকৃতিকভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা হারাতে পারেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি বৈশ্বিক জনতাত্ত্বিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিতে পারে যেখানে জনসংখ্যা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শেষ কথা: আমাদের করণীয়
এই সংকট থেকে বাঁচার জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার সমন্বয় প্রয়োজন। প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং বিপিএ মুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া একটি ভালো শুরু হতে পারে। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অর্গানিক খাবার যুক্ত করা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা শুক্রাণুর মান উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো মানসিক জড়তা কাটিয়ে ওঠা। বন্ধ্যাত্ব কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক অবস্থা। সিয়ারান হ্যানিংটনের মতো যারা এই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আইসিএসআই বা বিশেষায়িত আইভিএফ পদ্ধতি আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে পরিবেশকে বিষমুক্ত করা না গেলে কোনো কৃত্রিম পদ্ধতিই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারবে না।

















